৯ই আশ্বিন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার, বিকাল ৩:১৫

‘অনুমতিসাপেক্ষ’ রাজনীতিতে বিএনপি ॥ সক্রিয় আ.লীগ ॥ চ্যালেঞ্জে জাপা

প্রাইমনারায়ণগঞ্জ.কম

নারায়ণগঞ্জে ‘অনুমতিসাপেক্ষে’ রাজনীতি করছে বিএনপি। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের কর্মসূচি ঘরবন্দী। সাংগঠনিক অবস্থাও নড়বড়ে। সর্বশেষ জেলা কমিটিকে বিলুপ্ত করা হয়েছে প্রায় মাস ছ’য়েক আগে। এরপর থেকে আর জেলা কমিটি করতে পারেনি তারা। আন্দোলন-সংগ্রামে যে যুবদল বা ছাত্রদলের ভূমিকা থাকে সবচেয়ে বেশি, সেই যুবদলও বর্তমানে অনেকটা নিস্ক্রীয়। ছাত্রদলের জেলা কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মাঝে রয়েছে বেশ দুরত্ব, মহানগরেও ঠিক একই অবস্থা।

এছাড়াও কমিটির বেশির ভাগ নেতার ছাত্রত্বও নেই বলে জানা গেছে। অনেকেই সন্তানের বাপ হয়েছেন। দলের সব উপজেলা কমিটির অবস্থাও বেহাল। বর্তমান অবস্থায় মূল দল থেকে শুরু করে সহযোগী সব সংগঠনের নেতা-কর্মী ভয়ে আন্দোলন-কর্মসূচী এড়িয়ে চলেন। তবে দু/চারজন সাহসী নেতা আছেন যারা যে কোনো পরিস্থিতিতেই রাজপথে থাকেন। জেলা ও মহানগরের শীর্ষ নেতারাও বিষয়টা অবহিত আছেন। তারা বলছেন, একদিকে পুলিশ, অন্যদিকে সরকারি দল, মামলা, হামলা এর মধ্যে বিরোধী নেতা-কর্মীরা চিড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছেন।

জেলা বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, সরকার যাতে সঠিকভাবে চলে সেজন্য শক্তিশালী বিরোধী দল দরকার, সুষ্ঠু রাজনীতির পরিবেশ দরকার। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি নেই। তিনি বলেন, অনুমতিসাপেক্ষে রাজনীতি হয় না। অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মসূচিই পালন করা যাচ্ছে না। মিলাদ মাহফিলের মতো আয়োজন করতে গেলেও অনুমতি নিতে হচ্ছে।

সাংগঠনিক দুরবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও দু/এক জায়গায় দোয়া মিলাদ ছাড়া তেমন কোনো আনন্দ র‌্যালী করা সম্ভব হয়নি। তাই জেলা বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে জেলার রাজনীতিতে বিএনপির মতো শক্তিশালী একটি দলকে আরো বেশী গতিশীল করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করছেন।

তবে তিনি বলেন, এর আগেই যুবদল, ছাত্রদলসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর থানা ও ইউনিট পর্যায়ের কমিটিগুলো করা দরকার। কারণ আন্দোলন সংগ্রামে তাদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি থাকে। তিনি বলেন, মূল দলের জেলা শাখার কমিটিসহ সব সহযোগী সংগঠনের থানা, ইউনিয়ন ও ইউনিট কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে সততার সঙ্গে করতে হবে। লেজুড়বৃত্তিকে প্রাধান্য দিয়ে কমিটি করলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

আন্দোলন সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির ভূমিকা প্রসঙ্গে মহানগর বিএনপির এক নেতা বলেন, রাজধানী ঢাকায় যেভাবে সভা-সমাবেশ হচ্ছে, জেলা-মহানগর পর্যায়েও সেভাবে গা বাঁচানো কর্মসূচি করা হচ্ছে। শুধু জেলা-মহানগর পর্যায়ের আন্দোলন সংগ্রামে তো সরকার পতন হবে না। অনেক জেলা-মহানগরে খুব ভালো আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু তাতে কিছুই আসে যায়নি। রাজধানীতে আগে করে দেখাতে হবে। তখন জেলা-মহানগর পর্যায়ে তা এমনিতেই ছড়িয়ে পড়বে।

জোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের জোটের সবচেয়ে বড় শরিক জামায়াতে ইসলামী, তাদের এখন মাঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। অন্য শরিকদের দিয়ে কেবল নামের তালিকাই ভারী করা যায়, কাজের কাজ কিছুই হয় না।’ তিনি বলেন, সুষ্ঠু রাজনীতির পরিবেশ পেলে বিএনপির যে জনসমর্থন আছে, আন্দোলন সংগ্রাম করতে আর কারও প্রয়োজন হবে না।

অপরদিকে, জেলায় একজন মন্ত্রী, তিন এমপি ও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আছেন আওয়ামীলীগ থেকে। এ জেলায় সক্রিয় জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ তবে উপজেলা কমিটিগুলো দুরবস্থায় রয়েছে। ২০১৬ সালে আব্দুল হাইকে সভাপতি, ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সহ-সভাপতি ও ভিপি বাদলকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করেন। এর প্রায় বছর খানেক পর জেলা কমিটি পূর্ণাঙ্গতা পায়। ২০১৭ সালের অক্টোবরে জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেন খোদ দলীয় প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নতুন কমিটি গঠনের পর শুরুর দিকে ঐক্যবদ্ধ থেকে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠ তারাই দখল করে রাখেন।

তবে কিছুদিন পর জেলা আওয়ামীলীগের শূণ্য ৬ পদ পূরণ নিয়ে প্রথম দ্বন্দ হয় জেলা কমিটির দুই মেরুর নেতাদের মাঝে। তারপর উপজেলাগুলোর কমিটি গঠনের পর থেকে এ দ্বন্দ পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। এরপর থেকে দুই মেরুর নেতাদের খুব একটা একসাথে দেখা যায় না। এ দুই মেরুর এক প্রান্তে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, অপর প্রান্তের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই – সাধারণ সম্পাদক ভিপি বাদল।
বছর খানেক আগে নারায়ণগঞ্জ-১ আসন তথা রূপগঞ্জের এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতীক) পেয়েছে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। ফলে জেলার আওয়ামী রাজনীতিতে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। এর আগে নারায়ণগঞ্জ থেকে আওয়ামীলীগের মন্ত্রী হতে পারেননি কেউ।

জানা যায়, জেলা আওয়ামী লীগ দুটি গ্রুপে বিভক্ত হওয়ার পরও খুব ভালোভাবে মাঠে থাকলেও রয়েছে কিছু দুর্বলতাও। ইদানীং দলে গ্রুপিংয়ের বিষয়টাও আলোচিত হচ্ছে। তা ছাড়া উপজেলা কমিটিগুলোর অবস্থাও খুব খারাপ। বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ভালো নয়।

এসব বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতা বলেন, কেন্দ্র ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি পাওয়ার পর থেকে জেলা আওয়ামী লীগ জনমত গঠনে ও রাজনীতির মাঠে অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছে। পাড়ায় পাড়ায়, স্কুল-কলেজে জঙ্গিবাদ ও নাশকতাবিরোধী সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম সহ দলীয় সকল সভা-সমাবেশ সফলভাবে পালন করা হয়েছে। মাঝে করোনার জন্য বেশ কিছুদিন দলীয় কার্যক্রম বন্ধ ছিলো। তারপরও এ সময়েও আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে ও দলীয়ভাবে অসহায়, দু:স্থ ও হতদরিদ্রদের পাশে দাড়িয়ে কঠিক এ করোনা পরিস্থিতির মোকাবেলায় কাজ করে গেছে। তবে তিনি বলেন, বড় দলে সব সময়ই কিছুটা গ্রুপিং থাকে। কিন্তু অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগে গ্রুপিংয়ের মাত্রা অনেক কম।

মহানগর আওয়ামীলীগের সিনিয়র এক নেতা বলেন, আমাদের মহানগর কমিটিতে কারো সাথে কোনো দ্বন্দ বা কোন্দল নেই। কমিটি গঠনের পর থেকেই আমরা সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহার নেতৃত্বে জনগনের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। করোনা পরিস্থিতিতেও আমরা মানুষের জন্য কাজ করেছি। তাছাড়া ইতিমধ্যেই আমাদের মহানগর কমিটি সম্মেলন হয়ে যেত, তবে মহামারী করোনার কারণে কেন্দ্র থেকেই করোনা পরবর্তী সময়ে সম্মেলন করতে বলা হয়েছে। আশা করি খুব শীঘ্রই মহানগরের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, আর এবারও আমরা আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্ব এগিয়ে যাবো।

এদিকে জেলায় দুই জন এমপি থাকার পরও নেতা-কর্মী ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় পার্টির। জাতীয় পার্টি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও উপজেলার কোনো কমিটি নেই বললেই চলে। কেননা সম্প্রতি জেলা কমিটির আহবায়কও করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির বেশির ভাগই নারায়ণগঞ্জে নিয়মিত পালন করা সম্ভব হচ্ছেনা বলে জানায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

ওয়ার্কার্স পাটি, জাসদ, সিপিবি, বাসদ, ন্যাপ, সাম্যবাদী দল, বিজেপি, জেপি, এনপিপি, এলডিপি, বিকল্পধারা, কল্যাণ পার্টিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কাউন্সিল ছাড়া বিভিন্ন দিবসের কর্মসূচির মধ্যে সিমাবদ্ধ। গণমাধ্যম অফিসে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েই সময় পাড় করছেন তারা। মাঝে মাঝে সাম্প্রতিক কিছু ইস্যুতে মাঠেও দেখা যায় কিছু দলকে।

বাছাইকৃত সংবাদ

No posts found.